বোয়েসেল এর মাধ্যমে কোন কোন দেশে যাওয়া যায়: সরকারিভাবে নিরাপদ অভিবাসনের গাইডলাইন

দালাল ছাড়া সরকারি খরচে দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, জর্ডানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যাওয়ার সম্পূর্ণ তালিকা ও কাজের ধরন সম্পর্কে জেনে নিন।

1 49

নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করতে বোয়েসেলের মাধ্যমে কোন কোন দেশে যাওয়া যায়, তা নিয়ে কর্মপ্রত্যাশী সাধারণ মানুষের প্রবল আগ্রহ রয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ শতভাগ রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল) জি-টু-জি প্রক্রিয়ায় নিয়মিত বিভিন্ন দেশে দক্ষ কর্মী পাঠাচ্ছে। দালালের খপ্পর থেকে বাঁচিয়ে স্বল্প খরচে বিদেশে জনশক্তি রপ্তানিতে প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে।

এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে কাজের ধরন ও সুযোগ

বোয়েসেলের অন্যতম প্রধান গন্তব্য দক্ষিণ কোরিয়া। সেখানে এমপ্লয়মেন্ট পারমিট সিস্টেম (ইপিএস) প্রোগ্রামের আওতায় উৎপাদন, কৃষি ও নির্মাণ খাতে কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়। কোরিয়ায় মাসিক বেতন প্রায় দেড় থেকে দুই লাখ টাকা। সেখানে যেতে হলে ইপিএস-টপিক (EPS-TOPIK) ভাষা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া বাধ্যতামূলক। জাপানে টেকনিক্যাল ইন্টার্ন ট্রেনিং প্রোগ্রাম (TITP), নার্সিং, কেয়ারগিভার এবং আইটি পেশাজীবীদের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। দেশটিতে যেতে হলে জাপানি ভাষার এন-৪ বা এন-৫ (N4/N5) লেভেল সম্পন্ন করতে হয়।

নারী কর্মীদের জন্য জর্ডান অত্যন্ত নিরাপদ একটি গন্তব্য। বোয়েসেলের মাধ্যমে ক্লাসিক ফ্যাশন, এপিক বা মাস এপারেলসের মতো স্বনামধন্য গার্মেন্টস কারখানায় সরাসরি সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে নারী মেশিন অপারেটর নেওয়া হয়। নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ বিনা খরচে সম্পন্ন হয়। যাতায়াত ও থাকা-খাওয়ার ব্যয় বহন করে নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান। হংকংয়ে নামমাত্র খরচে নারী গৃহকর্মী পাঠানো হয়। এছাড়া ব্রুনাইয়ে কনস্ট্রাকশন, ওয়েল্ডিং এবং মধ্যপ্রাচ্যের কাতার, কুয়েত, ওমান, বাহরাইন ও আরব আমিরাতে নির্দিষ্ট প্রফেশনাল ও মেডিকেল পদে কর্মী নিয়োগ দেয় বোয়েসেল।

আজকের এই আর্টিকেলে আমি আপনাদের জানাবো বোয়েসেল ঠিক কোন কোন দেশে নিয়মিত কর্মী পাঠায়, সেখানে কাজের ধরন কেমন এবং কীভাবে আপনি দালাল ছাড়া সম্পূর্ণ সরকারি খরচে বা নামমাত্র ফি দিয়ে এসব দেশে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে পারেন। চলুন, আপনার নিরাপদ অভিবাসনের প্রথম ধাপটি আজই শুরু করি।

বোয়েসেলের মাধ্যমে সাধারণত কোন কোন দেশে কর্মী পাঠানো হয়?

বোয়েসেল (BOESL) হলো বাংলাদেশ সরকারের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ একটি শতভাগ রাষ্ট্রায়ত্ত জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান। এটি মূলত জি-টু-জি (G2G – সরকার থেকে সরকার) প্রক্রিয়ায় বিদেশে কর্মী পাঠিয়ে থাকে। বিভিন্ন দেশের চাহিদার ওপর ভিত্তি করে বর্তমানে বেশ কয়েকটি দেশে নিয়মিত কর্মী নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে প্রতিষ্ঠানটি।

এক নজরে দেখে নিই প্রধান গন্তব্যগুলোর তালিকা:

  • দক্ষিণ কোরিয়া: ইপিএস (EPS) সিস্টেমের মাধ্যমে সাধারণ কর্মী এবং স্টুডেন্ট ভিসায়।

  • জর্ডান: মূলত স্বনামধন্য গার্মেন্টস শিল্পে দক্ষ নারী ও পুরুষ কর্মী।

  • জাপান: কেয়ারগিভার, নার্সিং, আইটি পেশাজীবী এবং টেকনিক্যাল ইন্টার্ন (TITP)।

  • হংকং: নারী গৃহকর্মী বা ডমেস্টিক হেল্পার।

  • ব্রুনাই: নার্সিং, কনস্ট্রাকশন, ওয়েল্ডার ও বিভিন্ন কারিগরি কাজের জন্য।

  • মধ্যপ্রাচ্যের দেশসমূহ: কাতার, কুয়েত, ওমান, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে নির্দিষ্ট কিছু প্রফেশনাল, মেডিকেল (ডাক্তার/নার্স) ও টেকনিক্যাল পদে।

  • ইউরোপীয় দেশসমূহ: সম্প্রতি রোমানিয়া, ক্রোয়েশিয়া ও গ্রিসের মতো ইউরোপীয় দেশগুলোতেও সীমিত পরিসরে সরকারিভাবে কর্মী পাঠানো শুরু হয়েছে।

দেশভিত্তিক কাজের ধরন ও সুযোগ

আপনার দক্ষতা ও শিক্ষাগত যোগ্যতার ওপর নির্ভর করবে আপনি কোন দেশের জন্য উপযুক্ত। শুধু বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন দেখলেই হবে না, আপনাকে জানতে হবে কোন দেশে আপনার দক্ষতার চাহিদা আছে। চলুন, সবচেয়ে জনপ্রিয় গন্তব্যগুলোর কাজের ধরন সম্পর্কে একটু বিস্তারিত জেনে নিই।

১. দক্ষিণ কোরিয়া (সবচেয়ে বেশি চাহিদাসম্পন্ন):

দক্ষিণ কোরিয়া আমাদের দেশের তরুণদের কাছে এখন স্বপ্নের মতো। ইপিএস (EPS) প্রোগ্রামের আওতায় কোরিয়ায় মূলত ম্যানুফ্যাকচারিং (উৎপাদন), কৃষি এবং কনস্ট্রাকশন খাতে কর্মী নেওয়া হয়। এখানে বেতন যেমন আকর্ষণীয় (মাসে প্রায় দেড় থেকে দুই লাখ টাকা), কাজের পরিবেশও তেমনি চমৎকার। তবে এখানে যাওয়ার মূল শর্ত হলো আপনাকে অবশ্যই কোরিয়ান ভাষা পরীক্ষায় (EPS-TOPIK) পাস করতে হবে।

২. জর্ডান (নারী কর্মীদের জন্য নিরাপদ গন্তব্য):

আমার মতে, নারী গার্মেন্টস কর্মীদের জন্য জর্ডান সবচেয়ে নিরাপদ এবং নির্ভরযোগ্য গন্তব্য। বোয়েসেল নিয়মিত জর্ডানের ক্লাসিক ফ্যাশন, এপিক বা মাস এপারেলসের মতো বড় বড় গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির জন্য সরাসরি ইন্টারভিউয়ের মাধ্যমে মেশিন অপারেটর নিয়োগ দেয়। এখানে থাকা-খাওয়া ও যাতায়াত খরচ কোম্পানি বহন করে এবং নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ বিনা খরচে সম্পন্ন হয়।

৩. জাপান (উচ্চ বেতনের কারিগরি ও সেবামূলক কাজ):

জাপানে মূলত টেকনিক্যাল ইন্টার্ন ট্রেনিং প্রোগ্রাম (TITP), নার্সিং বা কেয়ারগিভার এবং আইটি (IT) পেশাজীবীদের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তবে জাপানে যাওয়ার ক্ষেত্রে একটি বড় শর্ত হলো আপনাকে জাপানি ভাষায় পারদর্শী হতে হবে (সাধারণত N4 বা N5 লেভেল)। আপনি যদি ভাষাটি আয়ত্ত করতে পারেন, তবে জাপানের মতো উন্নত দেশে আপনার ক্যারিয়ার হতে পারে অত্যন্ত উজ্জ্বল ও নিরাপদ।

৪. হংকং (মহিলা ডমেস্টিক হেল্পার):

নারীদের জন্য আরেকটি নিরাপদ কর্মসংস্থান হলো হংকং। বোয়েসেল সরকারিভাবে নামমাত্র খরচে হংকংয়ে মহিলা ডমেস্টিক হেল্পার বা গৃহকর্মী পাঠিয়ে থাকে। এখানকার কাজের পরিবেশ বেশ ভালো এবং বেতন কাঠামোও সন্তোষজনক।

৫. ইউরোপ ও অন্যান্য দেশ (নতুন সম্ভাবনার দ্বার):

অনেকেই আমাকে জিজ্ঞেস করেন, “ভাইয়া, ইউরোপে কি সরকারিভাবে যাওয়া যায়?” এর উত্তর হলো—হ্যাঁ, তবে সুযোগ কিছুটা সীমিত। সম্প্রতি বোয়েসেল রোমানিয়া, ক্রোয়েশিয়া এবং গ্রিসে কিছু দক্ষ কর্মী পাঠিয়েছে। সাধারণত কনস্ট্রাকশন, শিপইয়ার্ড, কৃষি এবং ওয়েল্ডিংয়ের মতো কাজে এসব দেশে লোক নেওয়া হয়। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে নার্স, ডাক্তার বা দক্ষ টেকনিশিয়ান হিসেবেও যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

বোয়েসেলের মাধ্যমে যাওয়ার সুবিধা কী?

বোয়েসেল এর মাধ্যমে কোন কোন দেশে যাওয়া যায়—এ প্রশ্নের উত্তরের চেয়েও বেশি জরুরি হলো কেন আপনি বোয়েসেলকে বেছে নেবেন, তা জানা। আমার দেখা মতে এর প্রধান সুবিধাগুলো হলো:

  • খরচ একদম কম: প্রাইভেট এজেন্সির মাধ্যমে যেখানে লাখ লাখ টাকা খরচ হয়, সেখানে বোয়েসেলের মাধ্যমে সরকারি ফি (দেশভেদে কয়েক হাজার থেকে সর্বোচ্চ এক-দেড় লাখ টাকা) দিয়ে যাওয়া যায়। জর্ডানের মতো কিছু দেশে তো নারীদের সম্পূর্ণ বিনা খরচেই পাঠানো হয়।

  • দালালমুক্ত ও শতভাগ নিরাপদ: এখানে প্রতারিত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আপনি সরাসরি সরকারি অ্যাকাউন্টে টাকা জমা দেবেন।

  • চাকরির নিশ্চয়তা: বোয়েসেল আগে থেকেই কোম্পানির সাথে চুক্তি করে, তাই বিদেশে গিয়ে কাজ না পেয়ে রাস্তায় ঘোরার কোনো ভয় থাকে না।

কীভাবে আবেদনের আপডেট পাবেন?

বোয়েসেলের নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ সরাসরি পরিচালিত হয়। প্রতিষ্ঠানটি গণমাধ্যমে খুব বেশি বিজ্ঞাপন প্রচার করে না। তাই আগ্রহীদের বোয়েসেলের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট (https://boesl.gov.bd/pages/notices) এবং ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে নিয়মিত নজর রাখতে বলা হয়েছে। নতুন সার্কুলার প্রকাশিত হলেই সেখানে শিক্ষাগত যোগ্যতা ও আবেদনের বিস্তারিত নিয়মাবলি উল্লেখ থাকে।

আমার একটি জরুরি সতর্কতা: বোয়েসেলের কোনো দালাল বা এজেন্ট নেই। আমি প্রায়ই দেখি অনেকেই না জেনে দালালকে টাকা দিয়ে বসে থাকেন। দয়া করে এই ভুলটি করবেন না। কেউ যদি আপনাকে বলে “আমি বোয়েসেলের লোক, আমাকে টাকা দিন, ভিসা করে দেব”—ধরে নেবেন সে একজন আস্ত প্রতারক! আর্থিক লেনদেন সব সময় বোয়েসেলের নির্ধারিত ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বা পোর্টালে করবেন।

বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্তটি জীবনের অন্যতম বড় একটি পদক্ষেপ। দালাল চক্রের মিথ্যা আশ্বাসে না ভুলে, নিজের দক্ষতা বাড়ান এবং সরকারি মাধ্যম ব্যবহার করুন। আশা করি, বোয়েসেলের কার্যক্রম ও গন্তব্য দেশগুলো সম্পর্কে আপনাদের একটি স্বচ্ছ ধারণা দিতে পেরেছি। আপনার বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতি কেমন চলছে বা কোনো নির্দিষ্ট দেশ নিয়ে জানার থাকলে নিচে কমেন্ট করে জানাতে পারেন। আপনাদের সবার নিরাপদ ক্যারিয়ারের জন্য অনেক শুভকামনা!

Leave A Reply

Your email address will not be published.